জানেন কি যিশুর ক্রুশবিদ্ধ দিনটাই কেন ‘গুড’?

জানেন কি যিশুর ক্রুশবিদ্ধ  দিনটাই কেন 'গুড'?

এই বছর গোটা বিশ্বে ১০ই এপ্রিল পালিত হচ্ছে ‘গুড ফ্রাইডে’ হিসাবে। সারা পৃথিবীর খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী মানুষরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এই দিনটা পালন করে থাকেন, এই দিনই ক্যালভেরিতে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল যিশু খ্রিষ্টকে। পবিত্র ইস্টার সপ্তাহের আগের শুক্রবার প্যাস্কাল টিড্রামের অংশ হিসাবে এই দিনটি পালিত হয়, শুধু তাই নয় অনেক সময় ইহুদিদের উত্সব পাসওভারের সঙ্গে একই দিন পালন করা হয় গুড ফ্রাইডে। অনেকের কাছে এই দিনটা ‘হোলি ফ্রাইডে’, ‘গ্রেট ফ্রাইডে’ বা ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ নামেও পরিচিত ।
খ্রিষ্টানদের কাছে আজকের এইদিনটা শোকের দিন। রোমানিয় সৈন্যদের দ্বারা আজকের দিনটিতেই কাঠের ক্রুশের উপর বিদ্ধ করার পর যিশুর মৃত্যু হয়। কিন্তু এখানে প্রশ্নটা হল যদি এই দিনটা শোকের দিন হয়, তাহলে একে গুড কেন বলা হয়? এই দিনটা খ্রিষ্ট ধর্মাবম্বলীদের জন্য সবচেয়ে দুঃখের, তাঁদের প্রিয় যিশুকে হারানোর দিন। কিন্তু তাঁদের বিশ্বাস ভগবান যিশু তাঁর জীবন উত্সর্গ করেছিলেন মানুষের মঙ্গলের জন্য। তাই এক কথায় যিশু খ্রিষ্টের ক্রুশবিদ্ধকরণ, মৃত্যু ও সমাধিমন্দির থেকে তার পুনরুজ্জীবনের স্মরণে এই উৎসবটি পালিত হয়।
খ্রিষ্টানরা এই দিনটার উদযাপন আনন্দের সঙ্গে করে না, বরং তাঁরা এই দিনটা স্মরণ করে যিশুর বেদনার কথা, তাঁর কঠিন যাত্রাপথের কথা, যিশুর প্রতি অবিচারের কথা-যেভাবে প্রথমে তাঁর বাবা তাঁকে ত্যাগ করে এবং পরে ন্যায়বিচারও পাননি তিনি। সবমিলিয়ে এটা একটা শোকের দিন। কিন্তু একটি গোষ্ঠী মনে করে এই উদযাপন আসলে হল পাপের বিরুদ্ধে পুন্যের জয়কে চিহ্নিত করে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়কে স্মরণ করতেই ‘গুড ফ্রাইডে’ পালিত হয়। গুড ফ্রাইডেতে ‘গুড’ শব্দটি আদতে চিহ্নিত করে ঐশ্বরিক শব্দটিকে, এটি আদতে গড’স ফ্রাইডের পরিবর্তিত রূপ। অনেক গোষ্ঠী আবার দাবি করেন প্রাচীন ইংরেজিতে ‘গুড’ শব্দটি ব্যবহার হল পবিত্র বা হোলি হিসাবে-সেই থেকেও এইরকম নামকরণ হতে পারে।

কোন বছর ক্রুশবিদ্ধ করা হয় যিশুকে? দুটি ভিন্ন গোষ্ঠীর মতে পুণ্য শুক্রবারর বছরটি হল ৩৩ খ্রিষ্টাব্দ। আইজ্যাক নিউটন বাইবেলীয় ও জুলিয়ান ক্যালেন্ডার এবং অমাবস্যার তিথি বিচার করে পুণ্য শুক্রবারর যে প্রকৃত সালটি নিরুপণ করেছেন, সেটি হল ৩৪ খ্রিষ্টাব্দ।

বাইবেলের বিবরণঃ

সুসমাচার অনুযায়ী, যিশুর শিষ্য যিহুদা ইসকারিয়োতের সাহায্যে রোমানিয় সৈন্যরা গেত্শিমানি উদ্যাগে যিশুকে গ্রেফতার করে। যিহুদা রক্ষীদলকে বলে রেখেছিলেন তিনি যাঁকে চুম্বন করবেন তিনিই হবেন যিশু। যিশুকে এরপর হাননের প্রাসাদে নিয়ে যাওয়ায় হয়, পরে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল প্রধান পুরোহিত কায়াফারের কাছে। সেখানেই বসেছিল প্রাচীন ইজরায়েলের সর্বোচ্চ আদালত সানহেড্রিয়ানের বিচারসভা। প্রধান পুরোহিত, কাযাফার, যিশুকে ইশ্বরনিন্দার দায়ে অভিযুক্ত করলেন, এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল ।

পরদিন রোমান রাজ্যপাল পন্টিয়াস পিলাতের বিচারসভায় যিশুর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহ, সিজারকে রাজস্বদানে বাধা ও নিজেকে রাজা ঘোষণা করার অভিযোগ আনা হয়। যিশু গালিলের লোক জেনে তিনি গালিলের শাসক রাজা হেরোদের উপর যিশুর বিচারের ভার ছেড়ে দিলেন। কিন্তু তিনি যিশুকে পাঠিয়ে দিলেন পিলাতের কাছে। পিলাত সমস্যা সমাধানের জন্য যিশুকে শুধুমাত্র চাবুক মেরে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব রাখলেন কিন্তু প্রধান পুরোহিত তখন যিশুর বিরুদ্ধে ঈশ্বরদ্রোহিতার নতুন অভিযোগটি আনলেন। শেষমেষ নিজের চাকরি রক্ষা করতে পিলাত যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার নির্দেশ দেন।
কথিত আছে, ছয় ঘণ্টা যিশু ক্রুশে যন্ত্রণাভোগ করেন। শেষ তিনঘন্টায় গলগোথার গোটা অঞ্চলে অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল। যিশু প্রাণত্যাগের পর ভূমিকম্প কেঁপে উঠল জেরুজালেম। ভেঙে গেল সমাধিপ্রস্তর।

সানহেড্রিয়ানের সদস্য তথা যিশুর গোপন অনুগামী আরিমাথিয়ার জোসেফ পিলাতের নিকট যিশুর দেহ চেয়ে নেন। তিনি যিশুর দেহ পরিষ্কার ক্ষৌমবস্ত্রে মুড়ে ক্রুসবিদ্ধকরণক্ষেত্রের অদূরে একটি বাগানে তার নিজের জন্য নির্মাণ করা প্রস্তরখোদিত সমাধিমন্দিরে রেখে দিলেন। ইহুদি সৎকার প্রথা অনুযায়ী তাঁকে সমাধিস্ত করা হয়। এরপর তৃতীয় দিন, রবিবার, যিশু পুনরুজ্জীবিত হলেন।

তাই এইদিন কোন সেলিব্রেশন নয়, কোন আলোকসজ্জা নয়, চার্চে গিয়ে কোনও মাস প্রার্থনা নয়, বরং রাত্রিজাগরণ, উপবাস, একান্তে প্রার্থনা এবং ভিক্ষাপ্রদানের মধ্যে দিয়েই গুড ফ্রাইডে উদযাপিত হয়। দোকানপাট বন্ধ থাকে, ঘোড়সওয়ারি, নাচ থেকে দূরে থাকেন ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টানরা।

Leave a Reply