জানেন কি কৃষি বিল ২০২০ কি ? কেনই বা এই বিলের বিরোধিতা করছেন কৃষকরা? জেনে নিন এক ক্লিকে

জানেন কি কৃষি বিল ২০২০ কি ? কেনই বা এই বিলের বিরোধিতা করছেন কৃষকরা? জেনে নিন এক ক্লিকে

গত রবিবার রাজ্যসভায় পাশ হয়ে গিয়েছে দুটি নতুন কৃষি বিল (Farm Bill 2020)। বিরোধীদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও সংখ্যাধিক্যের কারণে বিলটি পাশ করিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি।

এই বিলকে কেন্দ্র করে হরিয়ানা, পাঞ্জাব ও তেলেঙ্গানায় কৃষকরা বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেছেন। দেখে নিন কী এই কৃষি বিল এবং কেন সেটি নিয়ে কৃষকরা অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ প্রকাশ করেছেন –

কেন্দ্র তিনটি কৃষি বিল পেশ করেছে, বিলগুলি হল ‘অত্যাবশ্যক পণ্য আইন’ সংশোধন, ‘কৃষি পণ্য লেনদেন ও বাণিজ্য উন্নয়ন’ এবং ‘কৃষিপণ্যের দাম নিশ্চিত রাখতে কৃষকদের সুরক্ষা ও ক্ষমতায়ন চুক্তি’ বিল।

রবিবার তিনটি বিলের মধ্যে দুটি বিল লোকসভায় পাশ হয়ে গিয়েছে, সেগুলি হল ‘কৃষিপণ্য লেনদেন ও বাণিজ্য উন্নয়ন’ এবং ‘কৃষিপণ্যের দাম নিশ্চিত রাখতে কৃষকদের সুরক্ষা ও ক্ষমতায়ন চুক্তি’ বিল।

কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি অনুযায়ী এই বিলগুলির ফলে কৃষকদের রোজগার বাড়বে এবং কৃষিক্ষেত্রের উন্নতি হবে। এর ফলে ২০২২ সালের মধ্যেই কৃষকদের উপার্জন দ্বিগুণ হবে বলেও দাবি সরকারের।

সরকার আরও জানিয়েছে, এই বিলগুলি সরকার নিয়ন্ত্রিত বাজারের নিয়ন্ত্রণ থেকে কৃষকদের মুক্ত করবে এবং কৃষকরা তাঁদের কৃষি পণ্যের জন্য আরও বেশি দাম পাবেন।

এই বিলের প্রস্তাব হল এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা পণ্য কেনাবেচা করতে পারবেন মান্ডির বাইরেই। পাশাপাশি আন্তঃরাজ্য বাণিজ্যের উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে এবং পরিবহন খরচ কমানোর প্রস্তাবও করা হয়েছে বিলে।

সর্বোপরি এই বিলের উদ্দেশ্য কৃষকদের কৃষি-বাণিজ্য সংস্থা, রফতানিকারী এবং খুচরো পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করা এবং কৃষকদের কাছে আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া। এছাড়াও পাঁচ হেক্টরের কম পরিমাণ জমির কৃষকদের কাছেও লাভের পরিমাণ বাড়ানোর উদ্দেশ্য রয়েছে এই বিলগুলির।

কৃষকরা তাদের উৎপাদনের জন্য ন্যূনতম সহায়তা মূল্য পাওয়ার বিষয়ে শঙ্কিত। কৃষকদের ধারণা, এই বিল পাশ হওয়ার ফলে বাজার থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ সরে যাবে। সরকার ধীরে ধীরে ন্যূনতম সমর্থন মুল্যে ফসল কেনা বন্ধ করে দেবে।

ফলে কৃষকদের পুঁজিপতিদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে। পাশাপাশি কৃষি-বাণিজ্য ও বড় খুচরো ব্যবসায়ীরা কৃষকদের উপরে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে এই বিষয়েও উদ্বেগ রয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের আতঙ্ক রয়েছে সংস্থাগুলি কৃষি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা শুরু করে দিতে পারে।

উদ্বেগ কেন?
কৃষকদের উদ্বেগ , বাজার থেকে সরকারের নিয়ন্ত্রণের হাত উপর থেকে সরে গেলে ভারতের কৃষি বাজারে ব্যবসার আস্ফালন বাড়বে। ফলে ব্যবসায়ীরাই ধীরে ধীরে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে শুরু করবে। যার দ্বারা কৃষক দাম চাইলেও যোগ্য দাম পাবে না, বলে আশঙ্কা। এছাড়াও কৃষিপণ্যে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ ঘিরেও আতঙ্কিত চাষিরা।

. কৃষকের উত্পাদন ব্যবসা ও বাণিজ্য (প্রচার ও সুবিধাদি) বিল, ২০২০

বিধান –

✓ প্রথম বিলটি কৃষি বাজার সংক্রান্ত। এই বিলে বলা হয়েছে এমন একটি বাস্তুতন্ত্র তৈরি করা হবে, যেখানে কৃষক এবং ব্যবসায়ীরা রাজ্যের কৃষি পণ্য বাজার কমিটির আওতায় নিবন্ধিত কৃষিমান্ডিগুলির বাইরে খামারজাত পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের স্বাধীনতা পাবেন।

✓ রাজ্যের ভিতরে ও বাইরে কৃষি উৎপাদনের বাণিজ্য বাধামুক্ত হবে।

✓ বিপণন ও পরিবহন ব্যয় কমবে, যার ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের আরও ভাল দাম পাবেন।

✓ কৃষকদের ই-কমার্সের জন্য একটি সুবিধাজনক পরিকাঠামোও সরবরাহ করবে এই বিল।

বিরোধী দলগুলির আপত্তি –

✓ বিরোধী দলগুলি জানিয়েছে এই ব্যবস্থার ফলে রাজ্যগুলির রাজস্ব সংগ্রহে বড় ক্ষতি হবে। কারণ, কৃষকরা নিবন্ধিত মান্ডিগুলির বাইরে তাদের উত্পাদিত পণ্য বিক্রয শুরু করলে রাজ্য ‘ম্যান্ডি ফি’ পাবে না।

✓ এছাড়া, তারা প্রশ্ন তুলেছে, যদি সম্পূর্ণ কৃষিবাণিজ্যই মান্ডির বাইরে চলে যায়, সেই ক্ষেত্রে রাজ্যের নিযুক্ত ‘কমিশন এজেন্টদের’ কী হবে?

✓ সেই সঙ্গে এই বিল শেষ পর্যন্ত এমএসপি-ভিত্তিক অর্থাৎ সরকারের বেঁধে দেওয়া ন্যুনতম সমর্থিত মূল্যের ক্রয় ব্যবস্থার অবসান ঘটাবে।

✓ ই-এনএএম অর্থাৎ সরকারি কৃষিপণ্য বিক্রয়ের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মতো বৈদ্যুতিন বাণিজ্য সংস্থাগুলি কৃষি মান্ডিগুলির পরিকাঠামোই ব্যবহার করে।

✓ ব্যবসা বাণিজ্যের অভাবে যদি মান্ডিগুলিই ধ্বংস হয়ে যায় সেই প্ল্যাটফর্মগুলির ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা।

২. কৃষকদের (ক্ষমতায়ন এবং সুরক্ষা) মূল্য আশ্বাস এবং খামার পরিষেবার চুক্তির বিল, ২০২০

বিধান –

✓ এই বিলটি চুক্তিভিত্তিক চাষ সংক্রান্ত। এতে বলা হয়ছেে, কৃষকরা ভবিষ্যতের কৃষি পণ্য বিক্রির জন্য কৃষিবাণিজ্য সংস্থা, প্রক্রিয়াকারক সংস্থা, হোলসেলার, পাইকারি ব্যবসাদার, রফতানিকারক বা বড়মাপের খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে প্রাক-সম্মত মূল্যে চুক্তি করতে পারবেন।

✓ এই চুক্তির মাধ্যমে পাঁচ হেক্টরের কম জমির মালিক প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা লাভবান হবেন (ভারতের মোট কৃষকদের ৮৬ শতাংশই প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র কৃষক)।

✓ এতে করে অপ্রত্যাশিত বাজারের ঝুঁকি কৃষকদের কাঁধ থেকে তাদের স্পনসর সংস্থাগুলির কাঁধে স্থানান্তরিত হবে।
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে কৃষকদের আরও ভাল তথ্য পেতে সক্ষম করবে।

✓ বিপণনের ব্যয় কমিয়ে কৃষকদের আয় বাড়াবে।

✓ মধ্যস্থতাকারীদের এড়িয়ে কৃষকরা সরাসরি বিপণনে জড়িত থেকে সম্পূর্ণ দাম নিজেরাই পেতে পারবেন।

✓ প্রতিকারের সময়সীমা বেঁধে বিভিন্ন বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকরী প্রক্রিয়া তৈরি করা হবে।

বিরোধী দলগুলির আপত্তি

✓ চুক্তি চাষের ব্যবস্থাপনায় কৃষকদের ক্ষতিই হবে। কারণ তারা চুক্তির অন্য পক্ষের মতো দরাদরি করার বিষয়ে দক্ষ নন, তাই তাদের প্রয়োজনটা আদা করতে পারবেন না।

✓ টুকরো টুকরো করে বহু সংখ্যক ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকদের সঙ্গে চুক্তি করতে সম্ভবত স্পনসররা পছন্দ করবে না।

✓ বড় বেসরকারী সংস্থাগুলিই হোক কিংবা রফতানিকারী, পাইকারি ব্যবসায়ী বা প্রক্রিয়াকারকরা, বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ছোট কৃষকদের থেকে তারা অবশ্যই বেশি সুবিধা পাবে।

৩. অত্যাবশ্যক পণ্য (সংশোধনী) বিল, ২০২০

বিধান –

✓ এই বিলটি পণ্য সম্পর্কিত। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য়ের তালিকা থেকে খাদ্যশস্য, ডালশস্য, তৈলবীজ, পেঁয়াজ এবং আলু জাতীয় পণ্য সরিয়ে নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে এই বিলে।

✓ যুদ্ধের মতো কোনও ‘অস্বাভাবিক পরিস্থিতি’ বাদে এই জাতীয় পণ্যগুলি মজুতে সীমা আরোপ করা হবে না।

✓ এই বিধান বেসরকারী বিনিয়োগকারীদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা দূর করবে। ফলে বেসরকারী ক্ষেত্র / বিদেশী বিনিয়োগকারীরা কৃষিক্ষেত্রে আকৃষ্ট হবে।

✓ এতে করে, কোল্ড স্টোরেজের মতো কৃষি পরিকাঠামো এবং খাদ্য সরবরাহের শৃঙ্খলকে আধুনিকীকরণের জন্য বিনিয়োগ আসবে।

✓ দামে স্থিতিশীলতা এনে কৃষক এবং গ্রাহক উভয়ই সহায়তা করা হবে।

✓ প্রতিযোগিতামূলক বাজারের পরিবেশ তৈরি করে কৃষিপণ্যের অপচয় বন্ধ করা হবে।

বিরোধী দলগুলির আপত্তি

✓ বিরোধীদের বক্তব্য ‘অস্বাভাবিক পরিস্থিতি’র যে উদাহরণ সরকার দিয়েছে সেই রকম চরম পরিস্থিতি সম্ভবত কখনই তৈরি হবে না।

✓ বড় সংস্থাগুলি পণ্য মজুদ করার স্বাধীনতা অর্জন করার অর্থ তারা কৃষকদের উপর শর্ত আরোপ করার সুযোগ পাবে। যার ফলে চাষীরা কৃষিপণ্যের কম মূল্য পেতে পারেন।

✓ এই বিধান পেঁয়াজের রফতানি উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করেছে।